রাত তখন প্রায় বারোটা ভূতের গল্প


 

রাত তখন প্রায় বারোটা।

মাগরিবের পর থেকেই মেঘ জমে ছিল, কিন্তু বৃষ্টিটা নামল ঠিক যখন সারাদিনের কাজ সেরে আমি চা খেতে ঘর থেকে বের হলাম।

মোমবাতির আলোয় চায়ের দোকানের প্লাস্টিকের পর্দায় টুপটাপ শব্দ হচ্ছিল।

সবার কথার ভেতর দিয়ে কেউ একজন বলল—

“শিউলি নাকি আর ফিরে আসবে না।”

চায়ের কাপ হাতে থেমে গেলাম।

শিউলি—যে মেয়েটা তিন বছর ধরে আমাকে এমনভাবে দেখত, যেন আমি ছাড়া পৃথিবী টেনে আনা যাবে না।

দুই সপ্তাহ ধরে ওর কোনো খোঁজ ছিল না। ফোন বন্ধ, মেসেজ ব্লক—সব।

সেদিনই জানলাম, ওর পরিবার হুট করে অন্য বিভাগে জায়গা বদলি করে চলে গেছে।

কেউ বলে, বিয়ে ঠিক করেছে। কেউ বলে, অপমান এড়াতে পালিয়েছে।

কারো কথা বিশ্বাস করতে পারিনি।

যা বিশ্বাস করেছি—আনুমানিক তিন বছরের সম্পর্ক কাউকে না কাউকে পোড়ায়।

আমাকে পোড়ালো প্রচণ্ড।

রাতেই বাস ধরলাম। গন্তব্য—ওদের নতুন জায়গা, খুলনার একটা গ্রাম, তালবোনা।

দু’চোখে নিদ্রা নেই। মাথায় শুধু একটাই কথার প্রতিধ্বনি—

“আমি চলে গেলে তুমি একদিন পাগল হয়ে যাবে।”

শিউলি হাসতে হাসতে বলেছিল।

সেদিন ওর অর্থ বুঝিনি।

এখন বুঝছি—হয়তো ঠিকই বলেছিল।

তালবোনা গ্রামটা অদ্ভুত।

ফজরের আগে পৌঁছে দেখি পুরো এলাকা কুয়াশায় ডুবে আছে, কিন্তু কুয়াশার রংটা সাদা নয়—ধূসর।

এমন যেন কারো জ্বলন্ত ভেজা কাঠের ধোঁয়া।

উঠোনে দাঁড়াতেই দেখি শিউলির ছোট ভাই।

আমাকে দেখে থমকে গেল।

“আপনি! এখানে কেন?”

“শিউলি কোথায়?”

ছেলেটা চোখ নামিয়ে বলল—“অপা এখন ভালো নেই।”

কথাটা অদ্ভুতভাবে বলা।

“ভালো নেই”—এর মানে অসুস্থ কি মানসিকভাবে খারাপ?

ও কিছুই পরিষ্কার করলো না। বরং একটু ভেবে বলল—

“আপনি অপাকে দেখতে পারবেন না।”

আমি পিছিয়ে আসার লোক না।

“ওইটা সিদ্ধান্ত নেবে শিউলি। যাবো।”

ছেলেটা আর কিছু বলল না। মুখ সরিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

ওদের বাড়ির বাঁশের বেড়ার ফাঁক দিয়ে আমি ভেতরে তাকাতেই একটু থমকে গেলাম—

ঘরের দরজায় লম্বা লাল চিহ্ন।

গ্রামের ভাষায় ওটাকে বলে ‘মানতর দাত’, মানে—ভেতরে কাউকে আটকানোর চিহ্ন।

কেন?

শিউলিকে কেন আটকানো হবে?


যেভাবেই হোক শিউলির কাছে পৌঁছানো লাগবে।

সকাল হতেই মসজিদের পেছনে একটা সরু রাস্তা ধরে বাড়ির পেছনের অংশে গেলাম।

বাড়ির চৌদ্দকোনা জানালা খোলা।

জানালার সামনে দাঁড়াতেই—

আমার শ্বাস আটকে গেল।

শিউলি বসে আছে।

চুল এলোমেলো, মুখ শুকনো, চোখের নিচে কালি জমে আছে।

কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়—

ও আমাকে দেখল না।

আমার দিকে তাকাল, কিন্তু চোখের ভেতরে সেই পুরনো উষ্ণতা নেই, নেই যত্ন, নেই ঘনিষ্ঠতার একফোঁটাও।

মনে হলো, এই দৃষ্টিটা আমার মধ্যকার মানুষটাকে দেখে না—দেখে একটা দেয়াল।

আমি ডাকলাম—

“শিউলি…”

সে চমকে উঠল।

তারপর ধীরে ধীরে গলায় শব্দ করল—

“তুই এখানে কেন?”

এই প্রশ্নটা “রাগ” নিয়ে করা হয়নি—

এটা ছিল “ভীত” মানুষের প্রশ্ন।

“তুই কোথায় ছিলি? আমাকে না বলেই—”

“তুই আমার কোনো কিছুই ছিলি না।

তুই যা ধরে ছিলি… সেটা ছিল ভুল।”

আমার বুকের ভেতর যেন কিছু ভেঙে গেল।

আমি আর কথা খুঁজে পেলাম না।

ও জানালা বন্ধ করে দিল।

ধপ।

শব্দটা যেন কফিন বন্ধ হওয়ার মতো লাগল।


গ্রাম থেকে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেল।

রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম, মাথা গরম, মন ভারী।

ধুলার পথে একটা ছায়া লম্বা হয়ে টেনে আসছিল।

প্রথমে ভাবলাম নিজেই হয়তো ছায়া ফেলছি।

পাঁচ মিনিট পরে দেখা গেল—

ছায়াটা আমার সাথে তাল মিলিয়ে হাঁটছে, অথচ আমি থামলে এটা থামে না।

মাথায় ধাক্কা খেলাম।

হঠাৎ তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে গেল, বুকে শীত ধরল।

কিছুক্ষণ পরে কানে একটা মৃদু ফিসফিসানি এল—

“ওকে ছাড়… ওকে ছাড়…”

আমি ঘুরে দাঁড়ালাম।

কেউ নেই।

শুধু নারকেল গাছের মাথায় বাজের মতো হাওয়া।

আমি দ্রুত হাঁটতে থাকলাম।

কিন্তু ছায়াটা এবার সামনে চলে এল।

রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে।

আমি দেখলাম—ছায়াটার কোনো মুখ নেই, হাত নেই, কেবল শরীরের আকার।

আমি দৌড়ালাম।

এমন দৌড় মানবজীবনে আর কখনো দেইনি।


আমি গ্রামে একমাত্র মানুষকে পেলাম, যাকে আমি বিশ্বাস করতে পারি—রফিক কাকা, আমাদের ভাড়াটে ক্ষেতমজুর ছিল একসময়।

আমাকে দেখে বলল—

“তুই কি জানিস না শিউলিরে কেন আটকাইয়া রাখছে?”

আমি মাথা নেড়ে না বললাম।

রফিক কাকা চুপ করে রইল বেশ কিছুক্ষণ।

তারপর ধীরে বলল—

“শিউলি তোকে ডাকে রাতে। আওয়াজ দিসে।

ওরে কেউ বিয়া দেয় নাই।

ওরে কোনো পরিবারও পালায়া নেয় নাই।

ও যে নিজেই নিজকে শেষ করতে চাইছিল… তুই জানিস?”

আমি হতবাক।

“কি বলতেছো?”

“ওর পরিবার ভয়ে আছে, তুই যদি আবার ওর সামনে আইসা দাঁড়াস, ও আবার নিজেরে ক্ষতি করবে।”

আমি ঠান্ডা হয়ে গেলাম।

এটা কি মানসিক রোগ?

নাকি—

আমি বললাম—

“কাকা… আমি যখন ওকে দেখলাম, ওর চোখে… কিছু ছিল না।”

রফিক কাকা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“ওর চোখে মানুষের কইরা কিছু নাই।

ওর ভিতরে এখনো বাস করে কে জানে কি।”

কথাটা বাস্তবসম্মত না, কিন্তু তার চোখের ভেতর ভয় দেখে মনে হলো সত্যি।


এবার রাতে আমি সোজা বাজারের রাস্তায় হাঁটছিলাম।

হঠাৎ কেউ ফিসফিস করে বলল—

“সাজিদ…”

আমি থমকে গেলাম।

শিউলি ছাড়া এ নামে কেউ ডাকত না আমাকে।

আমি ঘুরে তাকালাম।

অন্ধকার রাস্তা। কেউ নেই।

কাছে একটা পরিত্যক্ত দোকানের ভিতরে মৃদু আলো জ্বলছে মনে হলো।

আমি এগিয়ে গেলাম।

দোকানের ধুলোর মাঝখানে একটুকরো কাপড় পড়ে আছে, শিউলির ওড়নার রঙের মতো।

আমি ঝুঁকে ধরতেই—

আমার পেছনে কেউ দাঁড়ালো।

আমি ঘুরতেই দেখি—

শিউলি।

কিন্তু ওর চোখে রক্ত।

ঠোঁট সেলাইয়ের দাগের মতো ফেটে আছে।

ও খুব শান্ত গলায় বলল—

“আমারে ছাড়, সাজিদ… দয়া কইরা আমারে ছাড়।”

আমি স্তব্ধ।

“তুই কি বলতেছিস?”

ও ধীরে মাথা নাড়ল।

“তুই যদি আমাকে না ছাড়স, ও আমাকে ছাড়বে না।”

“ও” কে?

ওর কথা আর শেষ হলো না।

ও হঠাৎ এমনভাবে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে গেল, যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি ওর মাথা নিচে নামাচ্ছে।

ওর পেছনে…

দেখলাম সেই ছায়াটা দাঁড়ানো—

এইবার আকারটা পরিষ্কার—লম্বা, ফাঁপা বুক, গর্ত চোখ।

আমি দৌড়ে দোকান থেকে বের হয়ে গেলাম।

ওর চিৎকার পিছনে পিছনে আসছিল—

“আমারে বাঁচা সাজিদ! তুইই তো আমারে ধরতেস!”


রাতে আমি বুঝলাম যে আমার সাথে কোনো অদৃশ্য বাঁধন লেগে গেছে।

শিউলি আর আমাকে চায় না—

ওকে চায় অন্য কিছু।

আর আমাকে সে-জিনিসটা চায়—

কারণ ওকে ধরে রাখার চেষ্টা আমি বন্ধ করছি না।

সারা রাত আমি ঘুমোতে পারিনি।

মাঝরাতে জানালার কাচে টোকা পড়ল।

টপ। টপ। টপ।

আমি চোখ খুলতেই দেখি—

শিউলির মুখ জানালার ওপাশে।

আগের মতো না, চোখে অন্ধকার জমাট, ঠোঁট ফেটে রক্ত পড়ছে।

ও বলল—

“তুই যদি আমাকে ছাড়স না, তুইও আমার মতো হইয়া যাবি।”

“তুই আমার কিছু না, সাজিদ। আমাকে ছেড়ে দে। আমি মরতে চাই না, আর তোকে নিয়েও মরতে চাই না।”

আমার মাথা ঘুরে গেল।

ও কি আমাকে দায়ী করছে?

আমি তো ভালোবাসতাম!

তবে কি ভালোবাসা এতটাই ভারি হতে পারে, যে মানুষকে জিনিস বানিয়ে ফেলে?

পরদিন ভোরে খবর এল—

শিউলি নিখোঁজ।

বাড়ির খাটে কেবল শুকনো মাটি পড়ে আছে।

আমি রফিক কাকে নিয়ে খোঁজে বের হলাম।

গ্রামের পেছন দিকের ঝোপে গিয়ে দেখলাম—

মাটির মধ্যে কারো পায়ের চিহ্ন, আর পাশে নখ দিয়ে আঁচড়ানো মাটি।

মনে হলো কেউ মাটির নিচে ঢোকানোর চেষ্টা করছিল, আর কেউ উঠতে চাইছিল।

রফিক কাকা ঠান্ডা গলায় বলল—

“যে শক্তি মানুষেরে ভাঙে, সে শক্তিরে থামাইতে চাইলে মানুষও ভাঙে।”

আমি কোনো উত্তর দিতে পারলাম না।

দূর থেকে কুয়াশার ভেতর শিউলির ভাঙা গলা ভেসে এল—

“সাজিদ… তুই আমাকে ছাড়…”

এই ডাক আমার শরীরের সব শক্তি শুকিয়ে দিল।

আমি বসে পড়লাম।

মাটিতে হাত দিয়ে বললাম—

“আমি ছাড়লাম।

তুই মুক্ত।”

কথাটা বলার সাথে সাথে মাটির ভেতর থেকে এক দীর্ঘশ্বাসের মতো শব্দ বের হলো।

গ্রামের বাতাস হালকা হয়ে গেল।

ছায়াটাও আর কখনো আমাকে অনুসরণ করেনি।

শিউলিকে আর কখনো পাওয়া যায়নি।

ওর পরিবার বলল—

“ও চলে গেছে। নিজের মতো।”

কেউ বিশ্বাস করেনি।

আমি রাতে যখন ঘুমাই—

কখনো কখনো বাতাসে শিউলির গলার ক্ষীণ আওয়াজ পাই—

“এইবার আমাকে ধরে রাখিস না, সাজিদ…”

আমি আর রাখি না।

কারণ আমি বুঝেছি—

অধিকার যখন ভালোবাসার জায়গায় বসে যায়,

মানুষ জীবিত থাকে না।

মানুষ তখন ছায়া হয়ে যায়।

আর ছায়া কেউ কারো হওয়া উচিত না।


লেখক: মাশরুর কবির রোহান 


দ্রষ্টব্য: গল্পের লেখায় ছোটখাটো ভুল থাকলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। যদি সম্ভব হয়, মেসেজের মাধ্যমে জানাবেন। সবশেষে কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না, আজকের গল্পটি আপনার কেমন লেগেছে।


ভূতেরগল্প

পরবর্তী পোষ্ট পূর্ববর্তী পোষ্ট